লেখক : ✍️ সাঈদা সুলতানা
সহকারী মহাসচিব, হিউম্যান এইড ইন্টারন্যাশনাল
(আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা)।
নারীকে বিপদে ফেলার সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক ফাঁদগুলোর একটি হলো অতি-মিষ্টি প্রশংসা। কথাগুলো শুনতে নির্দোষ, এমনকি আনন্দদায়ক— “আপনাকে দেখে মনে হয় এখনও কলেজে পড়েন!”, “আপনার হাসিতে জাদু আছে!”, “এমন সুন্দরীকে পেয়েও কেউ ঝগড়া করে কীভাবে!” প্রথম দৃষ্টিতে এগুলো ভদ্রতা কিংবা সৌজন্যবোধ মনে হলেও, বাস্তবে এসব কথার পেছনে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে অন্য উদ্দেশ্য। বিশেষ করে লক্ষ্য করে দেখলে বোঝা যায়, এ ধরনের মন্তব্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবাহিত নারীদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়।
এই প্রশংসাগুলোর ভেতরের কৌশলটি খুব সূক্ষ্ম। প্রথমে আপনাকে বোঝানো হয়— আপনি আলাদা, আপনি বিশেষ, আপনি অনন্য। এরপর ধীরে ধীরে একটি তুলনা টানা হয়— আপনার এই বিশেষত্ব আপনার স্বামী নাকি বোঝেন না, কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তি ঠিকই বোঝেন। এখানেই শুরু হয় মানসিক ফাঁদ। প্রশংসার আবরণে ঢেকে দেওয়া এই তুলনাই নারীর মনে সন্দেহ, অভিমান ও অসন্তোষের বীজ বপন করে।
দাম্পত্য জীবন কোনো রূপকথা নয়। এখানে দায়িত্ব, ধৈর্য, বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক ত্যাগের প্রয়োজন হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টানাপোড়েন, মতবিরোধ বা অভিমান থাকতেই পারে। ঠিক এই দুর্বল মুহূর্তগুলোতেই বাইরের মিষ্টি কথার প্রভাব সবচেয়ে বেশি কাজ করে। সামান্য প্রশংসা তখন মনে বিষ ঢেলে দেয়— স্বামীর প্রতি ক্ষোভ বাড়ায়, নিজের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে সংসারের শান্তি নষ্ট করে।
অথচ নির্মম সত্য হলো— যারা এভাবে প্রশংসা করে, তাদের অধিকাংশই আপনাকে বিয়ে করতে চায় না, দায়িত্ব নিতে চায় না, কিংবা আপনার জীবনের বাস্তব বোঝা বহন করতে আগ্রহী নয়। তারা চায় কেবল ক্ষণিকের আনন্দ, সাময়িক আবেগ আর নিজের স্বার্থসিদ্ধি। যতদিন স্বার্থ থাকে, ততদিন আপনি ‘স্পেশাল’। উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেলে সেই বিশেষত্বের কোনো মূল্য আর থাকে না। তখন তারা আর ফিরে তাকায় না, রেখে যায় অনিশ্চয়তা, অনুশোচনা আর ভাঙনের ক্ষত।
এই ধরনের মানুষদের আচরণ সাধারণত একই রকম হয়। তারা আপনার সংসারের দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করে, আপনার অভিযোগগুলো মন দিয়ে শোনে, স্বামীর সামান্য ভুলকে বড় করে দেখায়। তারা কখনোই আপনার সংসার বাঁচানোর কথা বলে না; বরং অজান্তেই আপনাকে সেই পথেই ঠেলে দেয়, যেটা শেষ পর্যন্ত সংসার ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়। কারণ একটি স্থিতিশীল, সুখী সংসার ভাঙলে তাদের লাভ— আর আপনার ক্ষতি।
এখানে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি— ভালোবাসা কেবল সুন্দর কথা নয়, দায়িত্বও বটে। যে মানুষ সত্যিই আপনাকে ভালোবাসে, সে শুধু প্রশংসা করে না; সে আপনার অসুস্থতায় রাত জেগে পাশে থাকে, আপনার সন্তানের দায়িত্ব নেয়, সংসারের চাপ ভাগ করে নেয়, আপনার কষ্ট বোঝে এবং আপনাকে নিরাপত্তা দেয়। সে হয়তো কবির মতো শব্দ সাজাতে জানে না, কিন্তু জীবনের বাস্তবতায় সে আপনার সবচেয়ে বড় ভরসা।
অনেক নারীই এই জায়গায় ভুল করেন— প্রশংসাকে ভালোবাসা ভেবে বসেন। অথচ প্রশংসা আর ভালোবাসা এক নয়। প্রশংসা মুহূর্তের জন্য মন ভালো করতে পারে, আত্মসম্মান জাগাতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা দীর্ঘমেয়াদি। ভালোবাসা মানে দায়িত্ব, ত্যাগ, বিশ্বাস আর স্থায়িত্ব। যে সম্পর্ক কেবল কথার ওপর দাঁড়িয়ে, সেটি ঝড়ের সামনে টিকতে পারে না।
তাই নিজের জীবনে কার জায়গা দেবেন, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যে মানুষ আপনার সংসার ভাঙতে চায়, যে মানুষ আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে আপনাকে দাঁড় করায়, যে মানুষ আপনার দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে দেখে— তাকে যত দূরে রাখা যায়, ততই মঙ্গল। সম্পর্কের নামে এমন মানুষের প্রবেশ মানেই নিজের শান্তি, সম্মান আর ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
সমাজে নারীর জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সচেতনতা। প্রশংসা শুনে গলে যাওয়া নয়, বরং সেই প্রশংসার উদ্দেশ্য বুঝে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের অনুভূতিকে সম্মান করুন, কিন্তু আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেবেন না। কোনো কিছু আপনাকে অস্বস্তিতে ফেললে, সেটি নিয়ে নিজের সঙ্গে সৎ থাকুন এবং প্রয়োজনে আপনার স্বামীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। সমস্যার সমাধান সংসারের ভেতরেই খোঁজার চেষ্টা করুন, বাইরের কারও কাঁধে ভর করে নয়।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে— ক্ষণিকের প্রশংসার নেশা যতই মিষ্টি হোক না কেন, তার ফল অত্যন্ত তেতো এবং ভয়ংকর হতে পারে। একটি সাজানো সংসার, সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ, পারস্পরিক বিশ্বাস— এসব ভাঙার মূল্য কোনো প্রশংসাই দিতে পারে না। জীবন দীর্ঘ পথের নাম, আর এই পথে সবচেয়ে নিরাপদ সঙ্গী সেই মানুষটাই, যে দায়িত্ব নেয়, পাশে থাকে এবং নীরবে আপনার জন্য লড়াই করে।