-শাহ মোঃ আব্দুল মোমেন
মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল ১৯২৯ সালে রৌমারী থানার অন্তর্গত মন্ডলপাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত মন্ডল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জনাব নেওয়াজ উদ্দিন মন্ডল রৌমারীর একজন বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাত ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান।
শৈশবেই তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন ঘটনাক্রমে তিনি কানপুরের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় গমন করেন। সেখানে কঠোর অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও অসামান্য মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কানপুর এরাবিক কলেজ থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য, তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরেই তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
উচ্চশিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ও অসাধারণ মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন সময়ে তিনি মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ফুলব্রাইট বৃত্তি লাভ করেন। কিন্তু পারিবারিক নানা কারণে সেই বৃত্তির সুযোগ গ্রহণ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। রৌমারী অঞ্চলে তিনিই প্রথম কামিল ডিগ্রিধারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল ছিলেন বহুভাষাবিদ। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি ও আরবি—এই ছয়টি ভাষায় তিনি অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ভাষাগুলোর প্রায় সমান্তরাল ব্যবহারে তাঁর দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। পারিবারিক কারণে তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে যোগদান করেননি। পরবর্তীতে তৎকালীন সমগ্র রৌমারী থানার—যা বর্তমানে রৌমারী ও রাজিবপুর দুটি উপজেলায় বিভক্ত—ম্যারেজ রেজিস্ট্রার ও কাজী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
কাজী হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। বিবাহ নিবন্ধনের পাশাপাশি স্থানীয় বিচার-শালিস ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। তাঁর প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ, বিচক্ষণতা ও ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো এলাকায় একজন সম্মানিত ও মর্যাদাবান ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল ছিলেন গভীরভাবে শিক্ষানুরাগী ও সমাজমনস্ক একজন মানুষ। রৌমারী সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল অপরিসীম অবদান। কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রতিষ্ঠাকালীন আটজন শিক্ষককে তিনি নিজ বাড়িতে আশ্রয় প্রদান করেন। পরবর্তীতে তাঁরা সুযোগ ও সময় অনুযায়ী নিজ নিজ আবাসস্থলে স্থানান্তরিত হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সেই কঠিন সময়ে তাঁর এই সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়।
ব্যক্তিজীবনে মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল, উদার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী। ধর্ম, বর্ণ, বয়স কিংবা সামাজিক অবস্থানের কোনো ভেদাভেদ তাঁর হৃদয়ে স্থান পায়নি। ফলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ও প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্নেহ, সৌহার্দ্য, প্রজ্ঞা ও মানবিক আচরণ তাঁকে মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান করে দিয়েছিল।
তিনি ছিলেন চার পুত্র ও তিন কন্যাসন্তানের জনক। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তাঁর চার পুত্রের মধ্যে দুইজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। অপর দুই পুত্রও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকাবাসীর কাছে সুপরিচিতি লাভ করেন। তৎকালীন সময়ে রৌমারী বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ও যোগাযোগব্যবস্থার দিক থেকে অত্যন্ত পশ্চাৎপদ হওয়ায় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় কন্যাকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল ১৯৮৭ সালের ২৫ আগস্ট, মঙ্গলবার, দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রৌমারী হারায় একজন জ্ঞানী, শিক্ষানুরাগী, সমাজহিতৈষী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষকে।
তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রৌমারীর শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রযাত্রায় তাঁর অবদান এবং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার মতো। তাঁর কর্ম ও আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।আজ রিজিয়া রাজ্জাক ফাউন্ডেশন এবং রিজিয়া রাজ্জাক স্ট্রিট এর শুভ উদ্বোধন হয়েছে।