নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র হজ পালনের আজীবনের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে পায়ে হেঁটে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার দিনমজুর দুলাল হোসেন (৩৫)।
সৌদি আরবের হজ ভিসা না থাকলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অগাধ বিশ্বাস এবং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ২ নম্বর ডাহিয়া ইউনিয়নের তাড়াই বড়ইচড়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তিনি যাত্রা শুরু করেন।
দুলাল হোসেন ওই গ্রামের মৃত মকছেদ আলীর ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় আড়াই মাস আগে গ্রামের একটি চায়ের দোকানে আড্ডার সময় তিনি পায়ে হেঁটে হজ পালনের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই দীর্ঘ এই পথযাত্রার জন্য নীরবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
যাত্রার সময় তাঁর সঙ্গে রয়েছে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব সনদ, কিছু শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় পোশাক এবং অল্প কিছু অর্থ। স্বজন ও এলাকাবাসীর দোয়া নিয়ে তিনি শুরু করেন তাঁর স্বপ্নপূরণের অভিযাত্রা।
দুলাল হোসেন বলেন, “অভাবের কারণে ভিসা করার মতো সামর্থ্য আমার হয়নি। অনেক কষ্ট করে শুধু পাসপোর্ট করতে পেরেছি। বহুদিন ধরে হজ পালনের ইচ্ছা লালন করে আসছি। আল্লাহর ওপর ভরসা করেই পথে নেমেছি। সরকারের কাছে আমার বিনীত আবেদন, মানবিক বিবেচনায় যেন আমাকে সহযোগিতা করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে মানবিক সহযোগিতা কামনা করছি। আমার হজের স্বপ্ন পূরণে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করলে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।”
বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের মক্কা পর্যন্ত স্থলপথে যেতে হলে আনুমানিক ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হতে পারে।
সম্ভাব্য রুট হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, ইরান হয়ে সৌদি আরবে পৌঁছানোর বিষয়টি বিবেচনায় আসছে।
প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার হাঁটতে পারলে এ যাত্রায় কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তবে বিশ্রাম, অসুস্থতা, প্রতিকূল আবহাওয়া, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের সীমান্ত ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার কারণে যাত্রার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।
তবে শুধু পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অন্য কোনো দেশের সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি দেশে প্রবেশের জন্য বৈধ ভিসা ও প্রয়োজনীয় অনুমতি বাধ্যতামূলক। ভিসা ছাড়া সীমান্তে পৌঁছালে আটক, আইনি জটিলতা কিংবা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন যেকোনো ব্যক্তি।
একইভাবে সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনের জন্য নির্ধারিত হজ ভিসা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অপরিহার্য। শুধু পাসপোর্ট থাকলেই মক্কায় প্রবেশ বা হজ পালন করা সম্ভব নয়।
এত দীর্ঘ পথযাত্রায় খাবার, থাকার ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা, বৈরী আবহাওয়া, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে সীমিত ধারণাও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
দুলাল হোসেনের ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর ধর্মীয় অনুরাগ, দৃঢ় মনোবল এবং স্বপ্ন পূরণের অদম্য প্রত্যয় অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে বাস্তবতার নিরিখে ভিসা, আন্তর্জাতিক সীমান্ত পারাপার এবং বিভিন্ন দেশের আইন-কানুনই তাঁর এই যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।
তবুও দুলালের বিশ্বাস, মহান আল্লাহর রহমত এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক সহযোগিতা পেলে একদিন তিনি পবিত্র কাবাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—পবিত্র হজ পালন—সম্পন্ন করতে পারবেন।