নিজস্ব প্রতিবেদক : বিলুপ্ত হয়ে গেল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করেছে সরকার।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ-সংক্রান্ত আইন গেজেট আকারে প্রকাশের পর বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করেছে ইউনিটটি।
‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ ২০২৬ সনের ১৯ নম্বর আইন হিসেবে গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
নতুন আইনে র্যাবের নাম এবং এর গঠনের জন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯-এ সংযোজিত সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো রহিত করা হয়েছে। তবে র্যাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আইনি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বাতিল হচ্ছে না।
আইনে বলা হয়েছে, ‘র্যাব (কোর্ট পদ্ধতি ও বিভাগীয় কার্যধারা) বিধিমালা-২০০৫’ বহাল থাকবে। একইভাবে ওই বিধিমালা বা অন্য কোনো আইন ও বিধির অধীনে র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে থেকে চলমান বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং আদালতের কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।
আইনের স্থানান্তরসংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, বিলুপ্ত র্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা এসআরবির কাছে স্থানান্তরিত হবে। একই সঙ্গে র্যাবের তহবিল, নগদ অর্থ, ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায়-দেনা, চুক্তি, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাবের বই, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিলও নতুন ইউনিটের কাছে ন্যস্ত হবে।
অর্থাৎ, র্যাবের নাম এবং আগের আইনি কাঠামোর সংশ্লিষ্ট বিধান বিলুপ্ত হলেও এর বিদ্যমান জনবল, সম্পদ, প্রশাসনিক দায় এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এসআরবির কাছে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
বুধবার থেকে র্যাবের ওয়েবসাইট, লোগো ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘র্যাব’ নামের পরিবর্তে ‘এসআরবি’ ব্যবহার শুরু হয়েছে। নতুন ইউনিটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রেও ‘এসআরবি বাংলাদেশ’ লেখা লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে লোগোর নকশায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। বাহিনীটির প্রধান আহসান হাবীব পলাশ বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গেজেট প্রকাশের পর র্যাবের পরিবর্তে এসআরবি নামে সব কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
২০০৩ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯ সংশোধনের মাধ্যমে র্যাব গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়। পরের বছর ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাহিনীটির কার্যক্রম শুরু হয়।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন অভিযানে র্যাবের ভূমিকা আলোচিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পড়ে বাহিনীটি।
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব এবং বাহিনীটির তৎকালীন ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) অনুসন্ধান প্রতিবেদনে র্যাব বিলুপ্ত করা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত নন—এমন সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর র্যাব বিলুপ্ত করে বাহিনীটির কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি আরও জোরালো হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভায় এসআরবি আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে বিলটি উত্থাপনের পর ১০ সেপ্টেম্বর তা পাস হয়।
গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে র্যাবের আনুষ্ঠানিক অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং পুলিশের অধীনে নতুন নামে এসআরবির কার্যক্রমের সূচনা হলো।