নিজস্ব প্রতিবেদক :-
জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ভোট গণনা করতে দেরি হবে—এই উছিলা দেখিয়ে যদি কেউ সুযোগ নিতে চায়, তবে তা প্রতিরোধ করতে হবে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) যশোরে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক সফরে এসে এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন,‘নতুন গল্প শুনছি ইদানীং—এবার নাকি ভোট গণনায় অনেক বেশি সময় লাগবে। এই দেশের মানুষ হয়তো গত একযুগ ভোট দিতে পারেনি, কিন্তু ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের নেই—তা নয়। ১৯৯১ সালে তারা ভোট দিয়েছে, ১৯৯৬ সালে ভোট দিয়েছে, ২০০১ সালেও ভোট দিয়েছে। ভোট গণনায় কেমন সময় লাগে—বাংলাদেশের মানুষের সে ধারণা রয়েছে।’
দুপুরে যশোর উপশহর কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত এ জনসভার আয়োজন করে যশোর জেলা বিএনপি। সকাল থেকেই জনসভাস্থল, পাশের ঈদগাহ মাঠ, বাদশা ফয়সল স্কুল মাঠ এবং আশপাশের সড়কগুলো বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে।
এর আগে সকালে খুলনার নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেন তারেক রহমান। পরে হেলিকপ্টারে দুপুর ২টা ১৮ মিনিটে তিনি যশোরের উপশহর কলেজ মাঠে পৌঁছান। বেলা আড়াইটায় মঞ্চে ওঠেন তিনি এবং ২টা ৩৭ মিনিটে বক্তব্য শুরু করে প্রায় ৪০ মিনিট ভাষণ দেন।
এক ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত যশোর সফরের শেষ পর্যায়ে তিনি যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলা—যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিএনপি মনোনীত ২২ জন প্রার্থীর হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়ে তাঁদের বিজয়ী করার জন্য সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান অভিযোগ করে বলেন,‘তারা এখন তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নেওয়ার জন্য। তারা নাকি সৎ লোকের শাসন কায়েম করবে। এই প্রস্তাবটাই তো সবচেয়ে অসৎ প্রস্তাব। অসৎ প্রস্তাব দিয়ে কাজ শুরু করে কীভাবে আপনারা মনে করেন সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন?’
তিনি আরও বলেন,‘আপনারা সমগ্র জাতির সামনে মিথ্যা কথা বলেছেন যে আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন—আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। বাঁচার জন্য আপনারা এখন মিথ্যা কথা বলছেন। যারা নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলতে পারে, তারা নির্বাচনের পর কতটা মিথ্যা বলবে—তা সহজেই অনুমেয়।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন,‘আজ নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে এরা উঠেপড়ে লেগেছে।’
তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান, যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করে জনগণের ভোটাধিকার আবার কেড়ে নিতে না পারে।
দেশ পুনর্গঠনে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, জনগণের ভোটে সরকার গঠন করতে পারলে যশোরের ফুল বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি আখ চাষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, চিনিকলগুলো পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন,‘তিনি যশোরের উলাসী খাল খননের উদ্বোধন করেছিলেন। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে আমি নিজেও খাল কাটতে আসব।’
এ সময় তিনি সবাইকে এতে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে যশোর–কুষ্টিয়া অঞ্চলের জিকে প্রকল্প পুনরায় সচল করার প্রতিশ্রুতিও দেন।
কারও নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান বলেন,
‘একটি রাজনৈতিক দল দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী—নারীদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখার কথা বলেছে। ওই দলের নেতা দুই দিন আগে কর্মজীবী মা-বোনদের উদ্দেশে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা কলঙ্কজনক।’
তিনি হযরত খাদিজা (রা.)-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন,
‘হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। কাজেই কর্মজীবী নারীদের অপমান করার অধিকার কারও নেই।’
তারেক রহমান বলেন,‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমরা ভেবেছিলাম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন এসেছে। মনে করেছিলাম, এখন থেকে সব দল জনগণের মর্যাদা ও সম্মান বজায় রেখে রাজনীতি করবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে দেখলাম, একটি রাজনৈতিক দল ওই সময়ের পর দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী মা-বোনদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলা শুরু করেছে এবং তাদের ঘরের ভেতরে আটকে রাখার চেষ্টা করছে।’
তিনি আরও বলেন,‘বিএনপি বিশ্বাস করে—দেশ পুনর্গঠন করে এগিয়ে নিতে নারী-পুরুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অথচ কয়েকদিন আগে একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নারীদের সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
জনগণের ভোট ও সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম, খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা।