নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারী সদর উপজেলার টুপামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফারহানা সুলতানা কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা, সহকর্মীর অসদাচরণ এবং ঘটনার নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছেন।
এ বিষয়ে তিনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগের অনুলিপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে।
ফারহানা সুলতানা দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে কর্মরত। তিনি ইংরেজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী এবং বি.এড. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করেছেন। ২০১০ ও ২০১৭ সালে তিনি দুইবার জেলা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সরকারি শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা সফরের সুযোগ লাভ করেন। বর্তমানে তিনি নীলফামারী জেলার ইংরেজি মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের বালক দল জাতীয় পর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করে।
লিখিত অভিযোগে প্রধান শিক্ষিকা উল্লেখ করেন, গত ২৯ জুন ২০২৬ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি)–সংক্রান্ত আলোচনা চলাকালে একই বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে ওই শিক্ষক উত্তেজিত হয়ে তার দিকে তেড়ে আসেন, অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন এবং চাকরি করতে দেবেন না বলে হুমকি দেন। ঘটনাটি বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীর সামনেই ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষিকার দাবি, একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে এ ধরনের আচরণ তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে এবং কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে। এ ঘটনার পর নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি সংশ্লিষ্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষক ৭ জুন থেকে ১১ জুন ২০২৬ পর্যন্ত পূর্বানুমতি ছাড়া বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। এছাড়া তিনি নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করেন না এবং স্টাফ মিটিংয়েও অংশগ্রহণ করেন না বলে অভিযোগ করেন প্রধান শিক্ষিকা।
প্রধান শিক্ষিকার অভিযোগ, বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত একটি প্রজেক্টর ১৫ জুন ২০১৯ এবং একটি সাউন্ড সিস্টেম ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষক গ্রহণ করেন। তার দাবি, সাউন্ড সিস্টেমটি দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে জমা দেওয়া হয়নি; উপজেলা পর্যায়ের তদন্ত চলাকালে সেটি বিদ্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। তবে প্রজেক্টরটি এখনও বিদ্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জছিজুল আলম মণ্ডল বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রধান শিক্ষিকার দাবি, তদন্ত চলাকালে তিনি তার বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি। তাই বিষয়টির সব দিক বিবেচনায় নিয়ে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
এদিকে, ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় উভয়ের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিনিময় হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষক অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, যা একজন শিক্ষকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। প্রধান শিক্ষিকা আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থেকে বিভিন্নভাবে তাকে সামাজিক ও মানসিক চাপের মুখে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ফারহানা সুলতানা বলেন, “আমি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা চাই না। আমি শুধু একজন প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে নিরাপদ, সম্মানজনক ও ভয়মুক্ত পরিবেশে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা চাই। একই সঙ্গে আমার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।