আজিজুর রহমান মুন্না, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:–
“আমি চিরতরে দূরে চলে যাব,
তবু আমারে দেব না ভুলিতে”—এই অমর পঙ্ক্তির স্রষ্টা, দ্রোহের কবি, প্রেমের কবি ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী-২০২৬ উপলক্ষে সিরাজগঞ্জে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট ২০২৬) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সিরাজগঞ্জ শহরের ইবি রোডস্থ স্থানীয় পৌর ভাসানী মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
নজরুল একাডেমি, সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. হেলাল আহমেদের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. রায়হান কবীর মিঠুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) গণপতি রায়।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান দুলাল, বিশিষ্ট কবি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. আনিসুজ্জামান পাপ্পু, সাহিত্যপ্রেমী ও নজরুলভক্ত এবং ভিক্টোরিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সাজেদুল ইসলাম প্রমুখ।
এদিকে, বিকেলে বাদ আসর সিরাজগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী ইলিয়ট ব্রিজের পাশে অবস্থিত বায়তুল আমান ফায়ার সার্ভিস জামে মসজিদে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট নিঃশব্দে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি শুধু একজন কবিই ছিলেন না; ছিলেন যুগসংগীতের স্রষ্টা, শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মশাল।
“আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই চরণচিহ্ন”—এই অমর উচ্চারণের মধ্য দিয়ে নজরুল প্রমাণ করেছিলেন, কবিতা কেবল কাব্যিক রোমান্সের বিষয় নয়; কবিতা হতে পারে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শক্তিশালী হাতিয়ার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ও গান বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় নতুন প্রেরণা জুগিয়েছিল।
বিদ্রোহের পাশাপাশি নজরুলের কবিতা ও গানে ফুটে উঠেছে গভীর মানবপ্রেম। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারের পক্ষে তিনি সোচ্চার ছিলেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সাম্যের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে তিনি হয়ে উঠেছেন মানবতার কবি।
অদ্ভুত এক নিয়তির পরিহাস—যিনি কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠে গান জাগিয়ে তুলেছিলেন, জীবনের শেষ প্রায় ৩০ বছর তাঁকে বাকরুদ্ধ অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। তাঁর চোখের জল, মনের আকুতি ও নীরব অনুভূতিগুলো হয়তো অশ্রুতই থেকে গেছে। তবুও তাঁর সৃষ্টি আজও বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে জীবন্ত।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সসম্মানে দেশে এনে জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করে।
আজকের সমাজে বিভাজন, হিংসা ও অসাম্যের সময়ে নজরুলের আদর্শ আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তিনি আমাদের শেখান—ভেদাভেদ ভুলে মানবতার জয়গান গাইতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক হতে এবং ভালোবাসাকে সর্বোচ্চ শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে।
তাই নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী শুধু শোকের দিন নয়; এটি তাঁর অমর সৃষ্টি, আদর্শ ও মানবিক দর্শনকে নতুন করে স্মরণ করার দিন। তাঁর বাণী আমাদের হৃদয়ে নতুন উদ্দীপনা, সাহস ও ভালোবাসার আলো ছড়িয়ে দিক—এটাই হোক আজকের প্রত্যাশা।
নজরুল নিজেই লিখেছিলেন—
“মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই,
যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।”
সত্যিই, তাঁর কণ্ঠ আজও ধ্বনিত হয় বাঙালির হৃদয়ে—
“আমি চির বিদ্রোহী বীর—
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি
একা চির-উন্নত শির।”
আলোচনা সভা শেষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান “বাগিচায় বুলবুলি তুই, ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল” পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।