নিজস্ব প্রতিবেদক:-
যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে আজ মঙ্গলবার (২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে সারাদেশে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে। এ উপলক্ষে আগামীকাল বুধবার সরকারি ছুটি থাকবে।
পবিত্র শবে বরাতকে আরবি ভাষায় বলা হয় “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান”, অর্থাৎ শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত। ফারসি ভাষায় ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ নাজাত বা মুক্তি। এ কারণেই এই রাতকে শবে বরাত বলা হয়—যা মুসলমানদের কাছে ‘মুক্তির রাত’ হিসেবেও পরিচিত।
হিজরি সনের শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাতটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে এক সৌভাগ্যময় রজনী। বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য রহমত ও মাগফেরাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। তাই এ রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল নামাজ আদায়, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার এবং দোয়া-মোনাজাতে মগ্ন থাকেন। অতীতের সকল গুনাহ ও অন্যায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ভবিষ্যৎ জীবনের কল্যাণ কামনা করেন।
এই রাতে অনেক মুসলমান আত্মীয়-স্বজনদের কবর জিয়ারত করেন এবং মরহুমদের রূহের মাগফেরাত কামনা করেন।
পবিত্র শবে বরাত মুসলমানদের কাছে পবিত্র রমজানের আগমনী বার্তাও বহন করে। শাবান মাসের পরই মাহে রমজান আসে। ফলে শবে বরাত থেকেই মূলত রমজানের প্রস্তুতি শুরু হয়। এ উপলক্ষে অনেক পরিবারে হালুয়া, রুটি ও অন্যান্য উপাদেয় খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং তা আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ মাহফিল, দোয়া-মোনাজাত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হামদ ও নাতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে, পবিত্র শবে বরাতের রাতে বিস্ফোরক দ্রব্য, আতশবাজি, পটকা ও অন্যান্য ক্ষতিকর ও দূষণকারী দ্রব্য বহন ও ফোটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
বাসস জানায়, পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে এক বাণীতে দেশবাসী ও বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কল্যাণ কামনা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি এই পবিত্র রজনীকে রহমত, মাগফেরাত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির এক মহামূল্যবান সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী শবে বরাত বিশেষ ফজিলতপূর্ণ এবং ক্ষমা প্রার্থনার এক অনন্য সময়। হাদিসের বর্ণনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত ও ক্ষমা বর্ষণ করেন। তিনি আরও বলেন, শবে বরাতের শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও জাতির কল্যাণে প্রয়োগ করতে হবে। সকল অন্যায়, অবিচার, অনাচার ও কুসংস্কার বর্জন করে শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করে বলেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে ক্ষমা করেন, হেফাজত করেন এবং দেশ ও জাতিকে শান্তি, অগ্রগতি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন।
পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে এ বাণী প্রকাশ করা হয়।
বাণীতে তারেক রহমান বলেন, শাবান মাসের একটি মহিমান্বিত রাতের নাম শবে বরাত। এ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের সকল মুসলমানের অব্যাহত সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।
তিনি বলেন, এই পবিত্র রাতে ধর্মপ্রাণ বান্দারা সারারাত আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের সবাইকে সহিংসতা, রক্তপাত, হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করে মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণে সহিষ্ণুতা, সংযম ও সৌহার্দ্য অর্জনে নিজেদের নিবেদিত রাখতে হবে।
তিনি বিশ্বশান্তিসহ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করেন এবং শবে বরাতের এই পবিত্র রজনীতে দেশ, জাতি ও মুসলিম বিশ্বের উত্তরোত্তর উন্নতি, কল্যাণ ও শান্তি কামনা করেন।
হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন—> “আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
— (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে রহমত ও মাগফেরাত বর্ষিত হয়। তবে শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি এবং হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীরা এই সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে।
হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—> “পনেরো শাবানের রাত এলে তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোজা রাখো। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন—কেউ কি ক্ষমাপ্রার্থী আছে? আমি তাকে ক্ষমা করবো। কেউ কি রিজিকপ্রার্থী আছে? আমি তাকে রিজিক দেব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত তিনি আহ্বান করতে থাকেন।”
— (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৮৪)
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শাবান মাসে সকল গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যথাযথভাবে পবিত্র মাহে রমজানকে বরণ করার তাওফিক দান করুন।
আমিন🤲